দার্জিলিঙের সাথে আমার প্রথম পরিচয় গানে গানে। স্কুল জীবনের শেষের দিকে যখন বাংলা ব্যান্ডের গান গুলো সবার মনে ঘাঁটি গাড়ছে, তখন আমাকে দায়িত্ব নিয়ে বিগড়ে দিয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত। তার কথাতেই প্রথম খাদের ধারের রেলিংটা, তার কথাতেই প্রথম মেঘ করলেই ইচ্ছে করে ট্রেন টা ধরে ফেলি। তার আগে একটা পোশাকি পরিচয় হয়েছিল, অবনীন্দ্রনাথের বুড়ো আংলা পড়ার সময়। টুং, সোনাদা, ঘুমের কথা পড়তে পড়তে বাবার কাছ থেকে শুনেছিলাম দার্জিলিঙের গল্প। বয়েস বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাহাড়ে যাওয়ার নেশা।

সাম্প্রতিক কালে ভাগ্যক্রমে দার্জিলিং এবং ওই সার্কিট এর পার্শবর্তী বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠেছিল। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতেও আমি কার্পণ্য করিনি। তবে সত্যি বলতে যতক্ষণ না গাড়ি শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে শুকনা বা সেবক দিয়ে পাহাড়ের দিকে উঠছে , ততক্ষন কিন্তু পাহাড়ি আস্বাদ টা পাওয়া যায় না। তখনো ঘিঞ্জি, তখনো মানুষের কচকচানি, তখনো সেই আধ-কলকাতা ব্যাপার স্যাপার। তবে গাড়ির গতি বাড়লে, চারপাশে সবুজ বাড়ে। অটো, টোটো, রিক্সার ভিড় কমে তখন জানলার বাইরে আর্মি ক্যাম্প আর চা বাগানের অবস্থান। শেয়ার্ড গাড়ি তে থাকলে কথায় কথা বাড়ে, গল্প থেকে পরিচয় বাড়ে। আমি দেখি চারপাশের রাস্তাঘাট কতটা হটাৎ করে পরিষ্কার, হটাৎ স্নিগ্ধ। নিজের শহরটা এরম হতে পারে না বলে কোথাও একটা মনখারাপ।
দার্জিলিঙের পথে যেতে প্রথমে পরিচয় হয় রোমান্টিসিজম আর কুয়াশাতে মোড়া কিছু ছোট্ট ছোট্ট হিল স্টেশনের। সোনাদা, ঘুম, এরা কখনো রোদে ঝলমল করে, আবার কখনো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে শীতের কাঁপুনি নিয়ে। পারদ নামতে থাকার সাথে সাথে বুঝি কমে যায় শহুরে মনের মদ্ধ্যে জমে থাকা উৎকণ্ঠা আর চিন্তা। বুক ভোরে সবুজে নিশ্বাস নিতে পারা কি কম ভাগ্গ্যের পরিচয়? গাড়ির জানলার কাঁচের ওপাশে এক আধটা পাহাড়ি দোকান, তাতে কোথাও দৈনন্দিন সামগ্রী, কোথাও পাহাড়ি নুডলসের প্যাকেট। জীবন যাত্রা এখানে সরল, সাবলীল। বৈভবের অভাবে সৎ, লাক্সারির অভাবে কর্মঠ। হয়তো সেই জন্যেই পাহাড়ি মানুষ গুলো এতো ভালো, পর হয়েও আপন। নিজেদের বাড়ির বাইরে ছোট ছোট টবে বা প্লাস্টিকের ভেতরেই ছোট ছোট ফুলগাছ, প্রায় সব বাড়ি তেই। এই সরল যত্ন আমি কিন্তু সমতলের কোনো শহরে পাই না।

সত্যিকারের দার্জিলিং লুকিয়ে আছে কিন্তু শহরটার আনাচে কানাচে। আঁকা বাঁকা রাস্তা গুলোর কিছু কিছু উঠে যায় পাইন বনের ভেতর দিয়ে অচেনা নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে, আবার কিছু কিছু রাস্তা আবার পাক খেয়ে ঘুরে নেমে আসে চৌক বাজারের মাঝে। দুটোই দার্জিলিং, একটার অস্তিত্ব অন্যটার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কিন্তু তাদের স্বাদ আলাদা। কোথাও অনেক অনেক দূরের মেঘে ঘেরা কাঞ্চনজঙ্ঘা লুকিয়ে আছে, কোথাও ঘন বসতি মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে রোজকার হাট বাজার আর দর দাম। তিব্বতি এন্টিক দোকানের মালিক স্যামসন নামক বিদেশী বুড়ো, নিজেকে হনুমান বলে পরিচয় দেন। কুঙ্গা রেস্টুরেন্টের সার্ভার প্রিয়া, রিভলভারের শৈলেশ দাজু, এদের সঙ্গে কথোকপনে উঠে এসেছে দার্জিলিং কে জানতে পারা, হয়তো আপন বলে ডাকতে পারার স্পর্ধা।

ক্লক টাওয়ার দিয়ে এগিয়ে নিচের দিকে গেলে যেখানে রিঙ্ক মল টা শুরু হয়, তার আসে পাশে দোকান পাট গুলোতে কত চেনা চেনা জিনিসের বাজার, কিন্তু পাহাড়ের ছোঁয়ায় একটু অচেনা। ড্রাগন মার্কেটের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলার সময় তখন কিন্তু গোর্খাল্যান্ডের রাজনীতির থেকেও তিব্বতি আর নেপালি ইতিহাস আর সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ একটা কমুনিটির কথাই কিন্তু বেশি করে মাথায় আসে। এই অঞ্চলে কিছু পুরোনো নেপালি রেস্টুরেন্ট দেখেছি, লম্বাটে, খোপ খোপ কেবিনের সারি, একলা হয়ে পরা সন্ধ্যে বেলায় কারো কারো আশ্রয়ে। আবার এইখানেই খুঁজে পেয়েছি অঞ্জন-এর নেপালি পানশালা, জয়ী’স পাব।

আশ্চর্য ভাবে, দিনের দার্জিলিং আর রাতের দার্জিলিঙের বৈপরীত্য তাও খুবই মজার। একদম ভোরবেলা মলের চারপাশে হাঁটতে বেরোলে যে ধোঁয়া ওঠা চায়ের আমেজ টা পাওয়া যায়, গভীর কুয়াশা ঘেরা সন্ধ্যেবেলা সেটা বদলে যায় আলো আঁধারি চাঁদের জ্যোৎস্নায়। দার্জিলিঙের আবহাওয়া, রাস্তা ঘাটের ওঠা নাম, দেবদারু গাছ আর কংক্রিট হোটেল গুলোর সংস্পর্শ, হটাৎ করে পাহাড়ের খাদে লুকিয়ে থাকে চায়ের বাগান, সবের মধ্যেই এই পরিবর্তিত স্পেক্ট্রামের খেলা থেকে যায়। তাই হটাৎ করে রাস্তার মোড় ঘুরতেই পাহাড়ের কাছে চলে আসাটা এতটা প্রভাব ফেলে দেয় আমাদের দু চোখে।

খেতে ভালোবাসি। তাই কোনো জায়গা চিনতে গেলে সেই জায়গা টার রং-রস-গন্ধ বুঝতে গেলে আমাকে কাঁটা চামচের রাজত্বে ফিরে আস্তে হয়। দার্জিলিঙের কুইসিন টা একটু ছড়ানো ছেটানো, কোথাও নেপালি হেরিটেজ টিকিয়ে রাখার লড়াই, কোথাও বাঙালি মাছ ভাত এর উপনিবেশ বিস্তার, আবার কোথাও পরে থাকা পুরোনো ব্রিটিশ হেরিটেজের শেষ আস্ফালন। কিন্তু এদের মধ্যে থেকেই আমি তুলে নিতে পারি দার্জিলিঙের নির্যাস টা। কেভেন্টার্সের ছাদ থেকে আমার প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা, আবার কেভেন্টার্সের ছাদেই স্কুল জীবনের পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা। গ্লেনারিসে নেশায় নেশায় হারানো বব ডিলান-ই হোক বা কুঙ্গা তে থালা ভর্তি বীফ মোমো, শীতের মাঝে এই ভালো লাগার উষ্ণ প্রলেপ বুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো শুধু দার্জিলিঙেরি আছে।

অবশ্য সবটাই রূপকথা নয়। “বড়ই ঘিঞ্জি আজকে আমার সবুজ দার্জিলিং।” ছোট্ট ছোট্ট আঁকা বাঁকা রাস্তায় হটাৎ হটাৎ জমে এসেছে সুমো গাড়ির যানজট। নির্মল পরিবেশে হটাৎ করে নাকে উঠে এসেছে কাটা তেলের সালফারের বিশগন্ধ। বাঁধভাঙা ট্যুরিজম আর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা বাঙালি সেন্টিমেন্টালিজমের ধাক্কায়, শহর টা বড়োই কমার্সিয়ালাইস্ড, বড়োই জঙ্গলকাটা ইঁট পাথর। শহরের সাধারণ মানুষ, যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে এই ট্যুরিজমের সাথে যুক্ত, তাদের হয়তো মন থেকে সয়ে নেই এতটা শহুরে কৃত্রিমতার প্রতি । ট্যুরিস্টি সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্সগত আচার আচরণও কিন্তু এখানে যারা ঘুরতে আসেন আর এখানে যারা থাকেন, তাদের মধ্যে একটা ব্যবধান এনে দেয়। পেটের দায় আর ছবি তোলার তাগিদে প্রকৃতি উপেক্ষিত হয়, কিন্তু সাস্টেনেবল ট্যুরিজম এবং ডেভেলপমেন্টের পরিবেশ যদি তৈরী করা না যায়, তাহলে এই দার্জিলিং ও চলে যাবে পুরোনো স্মৃতির খাতায়।

ততদিন দার্জিলিঙের আবেদন আমাদের মজ্জায়। নস্টালজিয়া, রোমান্টিসিজম, ভালোবাসা আর ভালোলাগা মিলিয়ে একটা আশ্রয়। এই কারণেই হয়তো আমাদের মতো অনেকে নিউ জলপাইগুড়ির ট্রেন টা ধরে ফেলি। কারণে অকারণে বাতাসিয়া হয়ে মন পৌঁছে যায় চ্যাপ্টা ঠোঁটের দেশে। সন্ধ্যে বেলা মনটা আনচান করে ওঠে একটু পাহাড়ি মোমোর জন্যে। আসলে দিনের শেষে এই টুকুই সত্যি। বৃষ্টি ভেজা ম্যাল টায় কুয়াশা মেখে আরেক চক্কর হেঁটে আসা।

ছবি সমূহ: দেবাঞ্জন রায় এবং অনিন্দ্য দে








Leave a Reply